শীতের হরেক পদের পিঠা – আবেগ যেখানে ঐতিহ্য
explore

শীতের হরেক পদের পিঠা – আবেগ যেখানে ঐতিহ্য

শীতের-পিঠা

গত কয়েকদিন ধরেই চলছে ঝুম বৃষ্টি। দারুন গরম আবহাওয়ার পরে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটায় সিক্ত হয়েছে জনমানবের মন। সেই সাথে এই বৃষ্টি নিয়ে এসেছে পরবর্তী শীতের মৌসুমের আগাম আগমনী চিঠি।

আর শীত আসলেই অবশ্যভাম্বী হিসেবে বাঙ্গালির মনে প্রথম হানা দেয় নানারকম সুস্বাদু পিঠা পুলির কথা। সারাবছরই বাঙ্গালির ঘরে পিঠার একটা পদ নিয়মিত থাকলেও শীতকাল যেন এ দেশীয় মানুষের পিঠা খাওয়ার মৌসুম।

শীতের সকালে কাজে যাওয়ার আগে বা সন্ধ্যায় ফিরে মায়ের হাতের গরম গরম পিঠা একটু মুখে না দিলে চলবে কেন? আর এখন পিঠা বানাতে মায়েদের সাথে সাথে বাড়ির বউরাও যেন কম যায় না।

আমাদের আজকের আয়োজন দারুন সব শীতের পিঠার পরিচয় নিয়ে। শীত আসার আগেই জেনে নিন সুস্বাদু কিছু পিঠার আদ্যোপান্ত।

চিতই পিঠা

চিতই পিঠার সাথে গরুর মাংস বা ঝোলা গুঁড়। কি, জিভে জল চলে আসলো, তাই না? আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী পিঠার মধ্যে চিতই পিঠা অন্যতম।

চালের গুঁড়ার সাথে লবন ও পানি মিশিয়ে তৈরি করা হয় মাঝারি ঘনত্বের গোলা। আমাদের দেশে চিতই পিঠা ভাজার নানা রকম ছাঁচের লোহার বা মাটির খোলা পাওয়া যায়। খোলা চুলায় গরম করে এটি তেল মিশ্রিত কাপড় দিয়ে পিঠা ভাজার মাঝে মাঝে বারবার মুছে দেয়া হয়। তারপর খোলায় দেয়া হয় চালের গোলার মিশ্রণ। মাঝারি আঁচে এভাবে কিছুক্ষণ ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখলেই তৈরি হয়ে যায় মজাদার চিতই পিঠা।

দুধ চিতই বা ভিজা পিঠা

আমাদের দেশের সবচেয়ে সুস্বাদু এবং জনপ্রিয় পিঠার মধ্যে এটি একটি। এটি দুধ চিতই বা ভিজা পিঠা, দু নামেই আমাদের কাছে পরিচিত। এটি বানাতে প্রয়োজন পরিমান মত খাঁটি দুধ, কোরানো নারকেল, গুঁড়, তেজপাতা এবং এলাচ।

দুধ চিতই বানাতে প্রথমেই গুড় অল্প পানিতে জ্বাল দিয়ে গলিয়ে নেয়া হয়। সেই সাথে তেজপাতা আর এলাচ দিয়ে দুধ জ্বাল দিতে দিতে পাশের আলাদা চুলায় হতে থাকে চিতই পিঠা ভাজার কাজ।

দুধ আর গুড় দুটোই ঠান্ডা হয়ে এলে একসাথে মিশিয়ে আবার জ্বাল দেয়া লাগে। সেই সাথে দিয়ে দিতে হয় কোরানো নারকেল। পিঠা ভাজা শেষ হয়ে এলে গুঁড় মিশ্রিত জ্বাল দেয়া দুধে এক এক করে আলতো করে ভিজিয়ে দিতে হয় পিঠাগুলো। এভাবে কয়েক ঘণ্টা থাকার পর খাওয়ার উপযোগী হয়ে যায় দারুন মজার দুধ চিতই।

ভাপা পিঠা

সম্পূর্ণ ভাপে তৈরি এই পিঠা টি পছন্দ করেন না, এমন বেরসিক সম্ভবত কেউ নেই। চালের গুঁড়ার সাথে গুঁড় আর নারিকেলের দারুন এক মিশেলে তৈরি হয় সুস্বাদু ভাপা পিঠা।

প্রথমে একটি হাড়িতে পানি ভর্তি করে একটি ঢাকনা মাঝখানে ফুটো বা চালুনচির মত করে নেয়া হয়। তারপর হাড়ির মুখের চারিদিকে আটার গাম দিয়ে সেটি বায়ুরোধী করে লাগিয়ে দিয়ে চুলায় হাড়ি বসিয়ে দেয়া হয়।  

এর পর ছোট পিঠার আকারের বাটিতে প্রথমে চালের গুড়ো তারপর গুঁড়, এরপর নারিকেল এভাবে দিয়ে দিয়ে কয়েকটি স্তর করা হয়। তারপর সেটা দিয়ে দেয়া হয় গরম ঢাকনার ফুটো অংশে। তারপর সেটাকে অপর একটি ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়।

কিছুসময় পরে গরম পানির ভাপে চালের গুড়ো আর গুঁড় সিদ্ধ হয়ে এলে নামিয়ে নেয়া হয় গরম গরম ভাপা পিঠা।

ছিটা রুটি

আমাদের দেশে শীতকালে নতুন ধান খাওয়া চর্বিযুক্ত হাঁসের মাংস দিয়ে ছিটা রুটি খাওয়ার ঐতিহ্য বহু পুরনো। কিন্তু মজাদার এই রুটিটি বানানো একটু কসরতের ব্যপার বটে।

ছিটা পিঠা বানাতে চিতই পিঠার মত একই পদ্ধতিতে গোলা বানাতে হয়। অনেকে গোলার সাথে পিঠা নরম করার জন্য ময়দা মিশিয়ে থাকেন। ঘণ্টাখানেক রেখে দেয়ার পর একটি ননস্টিক প্যান চুলার আঁচ কমিয়ে দিয়ে গরম করে নিতে হয়। ননস্টিক প্যান না থাকলেও নরমাল তাওয়ায় তেল ভেজানো কাপড় দিয়ে বারবার মুছে নিয়েও আপনার কাজ হয়ে যাবে। তাওয়া বা প্যান গরম হয়ে এলে গোলায় সব কটি আঙুল ডুবিয়ে তাওয়ায় ছিটিয়ে ছিটিয়ে রুটির আকার তৈরি করা হয়। মিনিটের মধ্যেই রুটি ভাজা হয়ে এলে ডিমের ওমলেটের মত ভাঁজ করে তুলে নিতে হয় গরম গরম ছিটা পিঠা।

Categories : Blog

Leave a Reply